بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

🖤🖤

ইলমে দ্বীনের অনন্য সাধক

🤍🤍

মাওলানা শামশুল হুদা (রাহ.)

(পবিত্র স্মরণে: ‘কাতেব সাহেব হুজুর’)

জন্ম: ১০ আগস্ট ১৯৪৪
ইন্তেকাল: ১৯ আগস্ট ২০১৩
সেবাকাল: ৪১ বছর

জন্ম ও বংশ পরিচয়

দক্ষিণ চট্টগ্রামের পুণ্যভূমি ও ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি কাফেলার অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব হযরত মাওলানা শামশুল হুদা (রাহ.)। এই মহান মনীষী ১৯৪৪ সালের ১০ আগস্ট কক্সবাজার জেলার চকরিয়া থানাধীন বরইতলী ইউনিয়নের ফতেহ আলী সিকদার পাড়ার এক সম্ভ্রান্ত ও দ্বীনদার মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁর পিতা মাস্টার আবুল হোছাইন ও মাতা আমেনা খাতুন দম্পতি ছিলেন খোদাভীরু ও সজ্জন ব্যক্তিত্ব। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার জ্যেষ্ঠ। উল্লেখ্য, তিনি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম কিংবদন্তি আলেম, খতীবে আযম আল্লামা সিদ্দিক আহমদ (রাহ.)-এর সুযোগ্য চাচাতো ভাই।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

নিজ গ্রামের শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশে তাঁর শৈশবকাল অতিবাহিত হয়। ১৯৫৫ সালে বরইতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে পঞ্চম শ্রেণি উত্তীর্ণ হন। এরপরই তাঁর মনে দ্বীনি ইলম অর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়।

শিক্ষা সফরের ধারাবাহিকতা:

  • ১৯৫৬: বরইতলী ফয়জুল উলুম মাদরাসায় ভর্তি - প্রাথমিক দ্বীনি শিক্ষা শুরু
  • ১৯৫৮: মেখল মাদরাসায় গমন - মুফতিয়ে আযম আল্লামা ফয়জুল্লাহ (রাহ.)-এর ফয়েজ লাভ
  • ১৯৬১: জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ায় ভর্তি - দীর্ঘ ৯ বছরের সাধনা
  • ১৯৭০: দাওরায়ে হাদীস (টাইটেল) সম্পন্ন - ইলমি ময়দানের উজ্জ্বল নক্ষত্র

কর্মজীবন ও দ্বীনি খিদমত

শিক্ষা সমাপনান্তে তিনি রাজঘাটা মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে শিক্ষকতা জীবনের গৌরবময় সূচনা করেন। সেখানে ৬ মাস খিদমতের পর, ১৯৭১ সালে সাময়িকভাবে দৈনিক ‘সাজআত’ পত্রিকায় প্রধান ক্যালিগ্রাফার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

জীবনের সোনালী অধ্যায়

১৯৭২ সালে আল জামেয়া এমদাদীয়া আজীজুল উলুম পোকখালী মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তাঁর সুনিপুণ পাঠদান পদ্ধতি, গভীর জ্ঞান ও আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে কর্তৃপক্ষ অচিরেই তাঁকে সহকারী শিক্ষা পরিচালকের (নাযেমে তালীমাত) গুরুদায়িত্ব অর্পণ করে।

তৎকালীন শিক্ষা পরিচালক মাওলানা মাসরুর সাহেব (মহেশখালী হুজুর)-এর সাথে যৌথভাবে তিনি পোকখালী মাদরাসার শিক্ষা ব্যবস্থাকে এক মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করান।

🏆 যুগান্তকারী অবদান

কওমি অঙ্গনের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও ফলপ্রসূ আয়োজন ‘কিতাবি ও তারকীবী মুনাযারা’ (শাস্ত্রীয় ও ব্যাকরণিক বিতর্ক) মূলত তাঁদেরই যুগান্তকারী ও যৌথ মেধার ফসল। ছাত্রদের মেধার বিকাশ ও কিতাবের গভীরে ডুব দেওয়ার যোগ্যতা তৈরির লক্ষ্যে তাঁরাই সর্বপ্রথম এই অনন্য পদ্ধতি চালু করেন।

পরবর্তীতে মহেশখালী হুজুর প্রবাসে গমন করলে শিক্ষা পরিচালনার একক দায়িত্ব তাঁর কাঁধে অর্পিত হয়। জামিয়ার প্রধান মুরব্বি হযরত আল্লামা হুসাইন আহমদ (রাহ.)-এর প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনায় তিনি দীর্ঘ চার দশক (১৯৭২-২০১৩) অত্যন্ত দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার সাথে এই দায়িত্ব পালন করেন এবং মাদরাসাকে সফলতার শীর্ষ চূড়ায় নিয়ে যান।

প্রশাসনিক দক্ষতা ও ব্যক্তিত্ব

প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তিনি ছিলেন আপসহীন ও বজ্রকঠিন। ‘আইনের চোখে সবাই সমান’—এই নীতিতে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। বাহ্যিক কোনো দুর্বলতা বা শৈথিল্য প্রদর্শন করে মাদরাসার শৃঙ্খলা বিনষ্ট হতে দিতেন না।

তাঁর এক গাম্ভীর্যপূর্ণ ডাকে পুরো পোকখালী মাদরাসায় পিনপতন নীরবতা নেমে আসত।

তবে এই শাসন ছিল সম্পূর্ণ ইখলাস ও হিতাকাঙ্ক্ষায় পরিপূর্ণ, যার ফলে ছাত্র-শিক্ষক সকলেই তাঁর চাদরঘেরা ভালোবাসার পরম ভক্ত ছিলেন। স্বয়ং মুহতামিম সাহেব তাঁকে তাঁর কর্মজীবনের ‘শ্রেষ্ঠ বন্ধু’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।

ব্যক্তিগত গুণাবলী ও বহুমুখী প্রতিভা

ব্যক্তিজীবনে হযরত কাতেব সাহেব হুজুর ছিলেন সরলতা, উদারতা, মহানুভবতা ও কোমল হৃদয়ের এক মূর্ত প্রতীক। বাহ্যিক কঠোরতার অন্তরালে লুকিয়ে ছিল এক দরদী হৃদয়।

অতিথিপরায়ণতা

একাকী আহার করা তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ ছিল; দস্তরখানে দশজনকে নিয়ে বসতে পারলেই তাঁর অন্তর তৃপ্ত হতো।

ইলমি পারদর্শিতা

তাফসীর, হাদীস, ফিকাহ, নাহু-সরফ, বালাগাত ও দর্শনের মতো কঠিন শাস্ত্রে পারদর্শী মহান উস্তাদ।

বহু বছর তিনি ‘ইত্তেহাদুল মাদারিস বাংলাদেশ’-এর কার্যকরী পরিষদের সদস্য হিসেবে কওমি মাদরাসা শিক্ষার মানোন্নয়নে গঠনমূলক প্রস্তাবনা পেশ করেন।

শিল্পমনস্কতা ও শখ

ক্যালিগ্রাফি

আরবি, উর্দু, বাংলা ও ইংরেজি চার ভাষাতেই তাঁর হস্তাক্ষর ছিল মুক্তোর মতো ঝকঝকে। এজন্যই তিনি ‘কাতেব সাহেব হুজুর’ নামে পরিচিত।

দর্জি শিল্প

নিজ হাতে অত্যন্ত চমৎকার জুব্বা-কুর্তা সেলাই করতেন। পোকখালী মাদরাসার সুপরিকল্পিত ম্যাপ তাঁরই শিল্পকর্ম।

কৃষি ও মৎস্য

মাদরাসার আঙিনায় ফলদ ও ফুলের বাগান এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ করা ছিল তাঁর প্রিয় শখ।

আধ্যাত্মিক সাধনা (তাসাউফ)

ইলমি খিদমতের পাশাপাশি তিনি আত্মশুদ্ধির ময়দানেও ছিলেন একনিষ্ঠ সাধক। জামিয়া পটিয়ার সাবেক নায়েবে মুহতামিম, প্রধান মুফতি ও শিক্ষা পরিচালক ফকীহুল মিল্লাত আল্লামা মুফতী আবদুর রহমান (রাহ.)-এর নিকট তিনি আধ্যাত্মিক দীক্ষা (বায়াত) গ্রহণ করেন।

🌟 আধ্যাত্মিক মর্যাদা

কঠোর রিয়াজতের মাধ্যমে তাঁর ‘তৃতীয় খলীফা’ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। প্রতি বছর পবিত্র রমজান মাসে দীর্ঘ ৪০ দিনের ইতিকাফের মাধ্যমে তিনি নফসের تزكية (শুদ্ধিতা) অর্জন করতেন। জীবনে দুই বার তিনি পবিত্র হজব্রত পালন করেন।

ইন্তেকাল ও জানাজা

জীবনের শেষভাগে এই মহান জ্যোতিষ্ক ডায়াবেটিস ও কিডনিজনিত জটিল রোগে আক্রান্ত হন। দীর্ঘ প্রায় তিন মাস সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালের শয্যায় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে, অবশেষে ২০১৩ সালের ১৯ আগস্ট, রোজ সোমবার দুপুর ১:১০ মিনিটে লাখো ভক্ত ও অনুসারীকে কাঁদিয়ে রফীকে আলার দরবারে পাড়ি জমান।

إِنَّا لِلَّٰهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ

প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে তাঁর জানাজায় শরিক হন তৎকালীন সময়ের শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম। জানাজার নামাজে ইমামতি করেন তাঁর কর্মজীবনের সুদীর্ঘ সময়ের ঘনিষ্ঠতম সাথি, শায়খুল হাদীস মুফতী ইমদাদুল হক (সুফি সাহেব হুজুর) দাঃবাঃ।

📍 দাফন স্থান:

বরইতলী মিয়াজী পাড়া কবরস্থানে (বাইজা মোরা) এই মহান আল্লাহওয়ালা মনীষীকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

রেখে যান: ৬ পুত্র, ২ কন্যা, নাতি-নাতনি এবং অসংখ্য শাগরেদ ও গুণগ্রাহী।

আল্লাহ তায়ালা হযরতকে জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চ মাকাম দান করুন

آمين يا رب العالمين

উৎস: ‘মাশায়েখে চকরিয়া’, পৃষ্ঠা: ৩৮-৪১ থেকে পরিমার্জিত ও সংকলিত

মাদরাসার পরিচিতিতে ফিরে যান